আন্তর্জাতিক ডেস্ক | AdChannel24.com
প্রকাশের তারিখ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার পরিবহন স্বাভাবিক না হলে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যনিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্রুত সমঝোতা না হলে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকের ফাঁকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ উদ্বেগের কথা জানান জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল হোর্হে মোরেইরা দা সিলভা। তিনি জাতিসংঘের প্রকল্পসেবা কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমঝোতা না হলে কৃষি মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময় হাতছাড়া হতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের বাজারেও চাপ বাড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহনের জন্য এই নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি কৃষিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামাল এবং রাসায়নিক সার পরিবহনের ক্ষেত্রেও এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত শুরুর আগে বিশ্ববাজারে আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্য হওয়া ইউরিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত সালফারের প্রায় অর্ধেক এই প্রণালি দিয়ে যেত। ইউরিয়া বহুল ব্যবহৃত একটি নাইট্রোজেন সার। অন্যদিকে সালফার বিভিন্ন শিল্পপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ফলে এই নৌপথে দীর্ঘদিন ধরে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি উপকরণ আমদানিনির্ভর বিভিন্ন দেশেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে।
জাতিসংঘের উদ্যোগ ও সম্ভাব্য সমাধান
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ গত মার্চে সারবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল সহজ করতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে। এই উদ্যোগের আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার পরিবহনের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় পরিকল্পনাটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
হোর্হে মোরেইরা দা সিলভার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত হলে সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি চালু করা সম্ভব হতে পারে। পরিকল্পনায় ওমানে একটি সমন্বয়কেন্দ্র স্থাপনের কথা রয়েছে। এই কেন্দ্র থেকে জাহাজ নিবন্ধন, পণ্যের তথ্য যাচাই এবং নিরাপদ চলাচলের বিষয়গুলো সমন্বয় করা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত পাঁচটি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সুযোগ দেওয়া গেলে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে সার সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সহায়তা মিলতে পারে। জাহাজ চলাচলের সময় সেগুলোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত পরিদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হবে।
জাতিসংঘের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো, বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা চলতে থাকলেও কৃষি উপকরণের সরবরাহ যেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে না যায়। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি এবং কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রস্তাব আদান-প্রদান হলেও নৌপথ স্বাভাবিক করার বিষয়ে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের শর্ত এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রণালিটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সহায়তা দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
তবে জাতিসংঘের প্রস্তাবিত সার পরিবহনব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পাশাপাশি বাস্তব পরিচালনাগত বিষয়গুলোও সমাধান করতে হবে। জাহাজের নিবন্ধন, পণ্যের পরিচয় যাচাই, নিরাপদ চলাচলের অনুমতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
খাদ্যপণ্যের বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে
কৃষি উৎপাদনে সারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো পর্যাপ্ত সার পাওয়া না গেলে অনেক ফসলের ফলন কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশে কৃষি উৎপাদন আমদানিনির্ভর উপকরণের ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশে সরবরাহের দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্সের আগস্টের একটি প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে বিভিন্ন পণ্যের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। ওই পূর্বাভাসে শস্যের দাম সর্বোচ্চ ৮১ শতাংশ, তেলবীজজাত ফসলের দাম ৬৬ শতাংশ এবং প্রাণিজ পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব সংখ্যা সম্ভাব্য পরিস্থিতির পূর্বাভাস, নিশ্চিত মূল্যবৃদ্ধি নয়। বাস্তবে পণ্যের দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে সরবরাহ পরিস্থিতি, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি, পরিবহন ব্যয়, মজুত এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতিগত পদক্ষেপের ওপর।
সারের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব ফসলের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে পড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সব দেশে একই মাত্রায় প্রভাব পড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যবাজারের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সার সরবরাহের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কৃষি উৎপাদনের জন্য সারের নিয়মিত সরবরাহ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে সার ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় এবং কৃষি উপকরণের বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে সার বা খাদ্যের দাম ইতিমধ্যে বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য স্থানীয় বাজারের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। আমদানির উৎস, সরকারি মজুত, স্থানীয় উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, সার আমদানির ব্যয় এবং কৃষি মৌসুমে সরবরাহের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো নিশ্চিত করা গেলে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের প্রভাব কমাতে সহায়তা মিলতে পারে।
একাধিক নৌপথে বিঘ্ন বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে শুধু হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিই কাজ করছে না। জাতিসংঘের কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষি ও খাদ্যপণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত কৃষ্ণসাগর ও লোহিত সাগর অঞ্চলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন নৌপথে সংঘাত ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন দেখা দিলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ববাণিজ্য একটি পরস্পরনির্ভর ব্যবস্থার ওপর পরিচালিত হয়। কোনো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে জাহাজকে বিকল্প পথে চলতে হতে পারে। এতে যাত্রার সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়তে হয়।
জাতিসংঘের প্রস্তাবিত উদ্যোগ সফল হলে সার পরিবহনের ক্ষেত্রে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে অগ্রগতি হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সমঝোতা, নিরাপদ নৌচলাচল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার পরিবহন স্বাভাবিক করা এখন শুধু বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্রুত সমঝোতা হলে জাতিসংঘের পরিকল্পনা কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যথায় কৃষি মৌসুমে সরবরাহের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যচাপ বাড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
তথ্যসূত্র:Reuters-এর ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা UNCTAD-এর হরমুজ প্রণালিতে নৌপরিবহন ব্যাঘাতসংক্রান্ত বিশ্লেষণ।